February 20, 2023

পরিচিত অপরিচিত অনেক ভাইবোনই আমার হাজবেন্ড বা আমার সাথে নিজেদের দাম্পত্য সম্পর্কে...


পরিচিত অপরিচিত অনেক ভাইবোনই আমার হাজবেন্ড বা আমার সাথে নিজেদের দাম্পত্য সম্পর্কের কথা, সমস্যা ও জটিলতার কথা শেয়ার করেন৷ কিছু ব্যাপার আমরা নিজেরাই আমাদের আশেপাশের পরিবারগুলোতেও ঘটতে দেখেছি। এবং এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে বুঝতে পেরেছি যে এমন কিছু আচরণ আছে যা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম বা নাজায়েজ নয়, কিন্তু কাজগুলো দৃষ্টিকটু বা কষ্টদায়ক, যার ফলে পরিবারের সুখশান্তি কমে যায়।

যেমন - এরকম একটি ব্যাপার হলো-- স্ত্রী কে প্রয়োজনীয় হাতখরচ না দেয়া। কিংবা স্ত্রীর হাতে কোনো টাকা না দেয়া। (এবং আমি সেইসব মুসলিম পরিবারের কথা বলছি, যেখানে স্ত্রীরা স্বামীর বাধ্য। যারা সাংসারিক দায়িত্বেই কমবেশি সারাদিন কাটিয়ে দেয়। বাইরে গিয়ে জব করে না, বা তাদের আলাদা কোনো ইনকাম সোর্স নেই।)

উক্ত সংসারে স্বামী হয়তো স্ত্রীর প্রয়োজন মাফিক সবকিছুই সামনে হাজির করছে। খাওয়াদাওয়া, বাসাভাড়া, কাপড়চোপড়, ওষুধপত্র সবই এনে দেবে; কিন্তু স্ত্রীর হাতে একটি টাকাও দিতে নারাজ। কোনো যুক্তি বা কারণ ছাড়াই তারা স্ত্রীকে এভাবে ট্রিট করে। অনেকে আছে -- হয়তোবা স্ত্রীর হাতে খরচাবাবদ কিছু টাকা দেবে ঠিকই, কিন্তু পরে আবার সেই টাকার হিসাব নেবে কড়ায়-গণ্ডায়৷ এই ধরণের বৈবাহিক সম্পর্ক একজন নারীকে যথেষ্ট চাপের মুখে রাখে। তার মন স্বামীর প্রতি বিরাগভাজন হয়ে ওঠে। এবং এ কথা মনে হওয়া তার জন্য মোটেও অস্বাভাবিক না যে -- স্বামী তাকে বিশ্বাস করে না, বা তার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না।

আমাদেরকে একটা বিষয় বুঝতে হবে -- দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আস্থা। স্বামী সংসারের কর্তা, এই জন্য যদি সে মনে করে যে স্ত্রীর ওপর ইচ্ছামতো ছড়ি ঘোরাতে পারবে, বা "আমি তো সব দেখেশুনেই রাখছি, বউর হাতে টাকা দেয়ার কী দরকার!" কিংবা "মেয়েদের হাতে টাকা থাকলে তাদের বাইড় বাড়ে" ইত্যাদি... এই মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গী সংসারের জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহ তা'আলা পুরুষকেই ভরণপোষণের দায়িত্ব দিয়েছেন, ফলে সে পরিবারের জন্য টাকা কামাই করে৷ আর একইভাবে নারীরা যারা আল্লাহর বিধানের কদর করে, তারাও এই দায়িত্ব স্বামীর ওপর ছেড়ে দিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। এখনকার অনেক প্র‍্যাকটিসিং মুসলিম নারী আছে, যাদের নিজেদের উচ্চশিক্ষা বা কাজ করার দক্ষতা আছে, চাইলেই তারা ঘরের বাইরে গিয়ে টাকা উপার্জন করতে পারতো। কিন্তু আল্লাহর বিধানের কদর করে বিধায় স্বামীর পাশাপাশি নিজেরাও জব করতে নেমে যায় না। প্রয়োজন ছাড়া উপার্জনের কাজে জড়িত হয় না। সংসারের খেদমতে বিনামূল্যে শর্তহীনভাবে নিজেকে পুরোপুরি উজার করে দেয়। এই যে আল্লাহর কথা মেনে নিয়ে স্বামী-সংসারের প্রতি একজন স্ত্রীর নি:স্বার্থ ইনভেস্টমেন্ট -- এমন স্ত্রীকে কদর করতে পারাই বুদ্ধিমান স্বামীর বৈশিষ্ট্য। স্ত্রীর প্রতি মনোভাবটা যেন এমন না হয়, "সারাদিন ঘরে বসে কী করো" বা, "টাকা তো আমিই কষ্ট করে কামাই করি, তুমি তো কামাই করো না তাইলে তোমারে দিব কেন?"

অনেক পুরুষলোক আছে, যারা স্ত্রীর বেলায় টাকা খরচের ক্ষেত্রে এতটা হিসেবী যে তাদের দাম্পত্য সম্পর্কটা ভালোবাসার সম্পর্কের বদলে যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নেয়। স্বামীর কত ইনকাম স্ত্রী জানেও না বা স্ত্রীকে জানতে দেয়া হয় না, স্ত্রীর কাছে গোপন করে স্বামী তার সব টাকা অন্যান্য নানান খাতে খরচ করে, স্ত্রীকে তার প্রয়োজনীয় জিনিস দিতে গড়িমসি করে -- এসব পরিস্থিতিতে দেখা যায়, একসময় স্ত্রীরাও স্বামীর থেকে টাকা হাসিল করার জন্য ডেসপারেট হয়ে ওঠে। মিথ্যা বলে, ঝগড়াঝাটি করে বা চাপ দিয়ে টাকা আদায় করে নেয়। দিনকে দিন সম্পর্কটা হয়ে যায় বিষের মতো। কড়ায়-গণ্ডায় স্ত্রীর থেকে হিসাব নেয়া আর যেকোনো উপায়ে স্বামীর থেকে আদায় করে চলতে হয় যে সংসারে, সেখানে আর যা-ই হোক সুখ থাকে না।

স্ত্রীর হাতে নিয়মিত টাকা দেয়া, সামর্থ্য অনুযায়ী তার পরিবারের দেখভাল করা, খরচাবাবদ দেয়া টাকার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ না করা -- এ কাজগুলোর মাধ্যমে সহজেই স্ত্রীর মনজয় করা যায়। এ কাজগুলো স্বামীর ওপর ফরয তা না, তবে উত্তম বৈশিষ্ট্য এবং অসামান্য সওয়াবের কাজ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

"তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম।" (তিরমিযী)

"সাওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিববার-পরিজনের জন্য খরচ করে, তা তার জন্য সাদাকা হিসেবে পরিগণিত হয়।" (বুখারী, মুসলিম)

"কোনো দিনার তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করেছ, কোনো দিনার তুমি ব্যয় করেছ ক্রীতদাসকে মুক্ত করার জন্য, কোনো দিনার তুমি সাদাকা করেছ মিসকীনের জন্য এবং কোনো দিনার তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করেছ। সাওয়াবের দিক থেকে সর্বোত্তম হল যা তুমি তোমার পরিবারের জন্য খরচ করেছ।" (মুসলিম)

তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা ব্যয় করবে, আল্লাহ তাঁর প্রতিদান তোমাকে দেবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমাটি তুলে দিবে এর প্রতিদানও আল্লাহ তোমাকে দেবে।" (বুখারী, মুসলিম)

চিন্তা করুন, স্ত্রীর মুখে তুলে দেয়া এক লোকমার জন্যেও সওয়াব আছে। আর স্ত্রীর হাতে টাকা দেয়ার জন্য সওয়াব থাকবে না?

এমন অনেক ঘটনা দেখেছি, যেখানে স্ত্রী তাকে দেয়া হাতখরচার টাকা জমিয়ে উল্টো স্বামীর বিপদের সময় সাহায্য করেছে। মাসিক খরচের টাকা নিজের শখ পূরণের পিছে ব্যয় না করে উল্টো স্বামীর পরিবারের জন্য উপহার কিনে এনেছে। এর মানে অবশ্যি এই না যে, স্ত্রীকে টাকা দিয়ে স্বামীরা মনে মনে তার কাছ থেকে এগুলো প্রত্যাশা করা শুরু করবে৷ স্ত্রীর হাতে কিছু টাকা স্বামীর এমনিতেই রাখা দরকার, যেহেতু টাকার জরুরত পাগলেরও আছে৷ কেন দরকার, কোন কাজে দরকার -- সেটা পয়েন্ট বাই পয়েন্ট উল্লেখ করা এই আলোচনার উদ্দেশ্য না, এক এক জনের কাছে সেটা এক একরকম হতে পারে। তবে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন যেকোনো মানুষই বারবার অন্যের কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতে লজ্জাবোধ করবে। সে বাইরে কাজ না করে ঘরে বিনামূল্যে শ্রম দিচ্ছে। এজন্য তাকে যেন লজ্জিত হতে না হয়৷ স্বামীর কাছ থেকে কটু কথা, অপমানজনক উক্তি শুনতে না হয়৷

স্বামী যখন স্ত্রীকে ভালোবেসে এই কাজটুকু করবে, অর্থাৎ তাকে নিয়মিত হাতখরচ, বা তার কাছে সামর্থ্য অনুযায়ী মাসিক একটা এমাউন্ট দিয়ে রাখবে, তখন স্ত্রী বাইরে কাজ না করেও স্বাধীনভাবে খরচ করার আনন্দ উপভোগ করতে পারবে। এবং খুটিনাটি খরচের জন্য অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে না বা সামান্য ব্যাপারে কৈফিয়ত দিয়ে স্বামীর থেকে চেয়ে নিতে হচ্ছে না বলে স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করবে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তো এমনই হওয়া উচিত -- মধুর, ভালোবাসার। প্রতিযোগিতার নয়, সম্মান, মমতা ও সহযোগিতার। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবার সংসারকে সুন্দরভাবে হেফাজত করুক, আমীন।


আমার ফেসবুক প্রোফাইলে প্রথম প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copyright © Afifa Riahana
Designed by Thinkpool
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram